ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প মুহূর্তেই বদলে দিয়েছে হাজারো মানুষের জীবন। ধসে পড়েছে শত শত ভবন, নিহত হয়েছেন অন্তত ১ হাজার ৪৩০ জন, আহত ৩ হাজার ২৩৮ জন। এখনও কয়েক দশ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা স্বজনদের জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় দিন-রাত অপেক্ষা করছেন অসংখ্য পরিবার।

তাদেরই একজন আন্দ্রেইনা ভ্যালেরিও। ভূমিকম্পের দিন কর্মস্থল থেকে ছুটে আসেন তিনি। এক বছর দশ মাস বয়সী ছেলে সান্তিয়াগোকে খুঁজে বের করাই ছিল তার একমাত্র লক্ষ্য। ছেলেটি তখন আন্দ্রেইনার সঙ্গী রামসেস মেন্ডোজার সঙ্গে লা গুয়াইরায় তার শ্বশুরবাড়িতে ছিল।
কিন্তু সেখানে পৌঁছে তিনি দেখেন, পুরো ভবনটি ধসে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তার দেবর স্যামুয়েল মেন্ডোজা তখন খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে স্বজনদের খোঁজার চেষ্টা করছেন।
শনিবার ঘটনাস্থলে বিবিসির সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আন্দ্রেইনা জানান, তার ছেলে, সঙ্গী রামসেস, শ্বশুর-শাশুড়ি, দাদা-দাদি এবং ননদ—সবাই এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছেন। তবে তিনি আশা হারাননি।
আন্দ্রেইনা ও স্যামুয়েলের ভাষ্য, ওই ভবনে আরও কয়েকজন শিশুও আটকে রয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছে নয় বছর বয়সী লুকাস ও তিন বছরের আরানজা।
শনিবার এল সালভাদর ও স্পেনের উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেনি। তখন পর্যন্ত ভবনটি থেকে কাউকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
ভূমিকম্পের পরদিন সকালে স্যামুয়েল জানান, তিনি ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে এক নারীর কণ্ঠ শুনেছিলেন।
“প্রথমে বুঝতে পারিনি কার কণ্ঠ। তবে একটি শব্দ স্পষ্ট শুনেছিলাম—’বাঁচাও’।”
পরদিন আন্দ্রেইনাও ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে একটি শিশুর কান্নার শব্দ শুনতে পান।
তিনি বলেন, “আমি এখনও বিশ্বাস করি আমার ছেলে বেঁচে আছে। আমি বিশ্বাস করি, আমি যে কান্না শুনেছি, সেটি আমার সন্তানেরই। আমি জানি, আমার ছেলে এবং তার পরিবারের সবাই এই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠবে।”
আন্দ্রেইনা ও স্যামুয়েলের মতো হাজারো মানুষ এখন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া স্বজনদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় অঞ্চল লা গুয়াইরায় বহু পরিবার কোনো যন্ত্রপাতি ছাড়াই খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের অনেকেই দিনের পর দিন না ঘুমিয়ে কাটিয়েছেন। বেঁচে থাকা মানুষের সন্ধানে চিৎকার করতে করতে অনেকের কণ্ঠ ভেঙে গেছে।
শুক্রবার দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবেশীরা উদ্ধারকাজে যোগ দেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবক সহায়তা নিয়ে ছুটে আসেন।
দেশজুড়ে উদ্ধার অভিযান চললেও এমন দুর্যোগ মোকাবিলায় ভেনেজুয়েলার প্রস্তুতির ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
হোটেল এডওয়ার্ড এলাকায় পৌঁছে প্রতিবেদক জানান, বাতাসে মৃত্যুর গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছিল। সময় যত গড়াচ্ছিল, ততই স্পষ্ট হচ্ছিল—ধ্বংসস্তূপের নিচে দীর্ঘ সময় জীবিত থাকা অত্যন্ত কঠিন।
শুধু লা গুয়াইরা শহরেই অন্তত ৫০টির বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ভবন দেখা গেছে। সরকারি হিসাবে, পুরো অঞ্চলে ১ হাজার ৪০০টিরও বেশি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেস এটিকে গত ১২৩ বছরের মধ্যে দেশের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগ বলে উল্লেখ করেছেন।
এদিকে, অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেস জানিয়েছেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লা গুয়াইরা রাজ্যে ১৪ হাজার পুলিশ ও সামরিক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, শনিবার ১০টি দেশ থেকে উদ্ধারকারী দল সেখানে পৌঁছানোর কথা ছিল। এছাড়া এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রায় ৬০ শতাংশ পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।
প্রথমদিকে উদ্ধারকাজে ভারী যন্ত্রপাতির সংকট ছিল। পরে দুর্গম ও ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক পেরিয়ে কিছু যন্ত্রপাতি ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
এদিকে স্বেচ্ছাসেবীরা আহতদের ওষুধ বিতরণ করছেন, প্রয়োজনীয় পোশাক সংগ্রহ করছেন। তবে রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বিশেষায়িত সরঞ্জাম ছাড়াই স্বেচ্ছাসেবীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে মরদেহ উদ্ধার করে গাড়ি ও ভ্যানে করে নিয়ে যাচ্ছেন।
তীব্র যানজটের কারণে অ্যাম্বুলেন্স অনেক এলাকায় প্রবেশ করতে পারছে না। ফলে অনেক আহতকে মোটরসাইকেলের পেছনে বসিয়ে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।
কারাকাসের একটি হাসপাতালে লা গুয়াইরা থেকে আনা শত শত আহতের চিকিৎসা চলছে। এক চিকিৎসক জানান, সেখানে অন্তত ৬০০ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন, যাদের অধিকাংশেরই হাড় ভেঙেছে।
তিনি বলেন, শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি অনেকেই গভীর মানসিক ট্রমায় ভুগছেন। অনেকের প্যানিক অ্যাটাকও হচ্ছে।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
হাসপাতালের বাইরে নিহত ও চিকিৎসাধীন ব্যক্তিদের তালিকা টানিয়ে রাখা হয়েছে, যাতে স্বজনরা সহজে তাদের খোঁজ পান। পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তিদের ছবি ও পরিচয়সংবলিত পোস্টারও লাগিয়ে রেখেছেন অনেক পরিবার—হয়তো কোনো পরিচিতের চোখে পড়বে, মিলবে প্রিয়জনের একটি খবর, কিংবা ফিরে আসবে বেঁচে থাকার নতুন আশা।
সূত্র: বিবিসি
Follow iNews Zoombangla On Google
Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from iNews Zoombangla in your Google news feed.

