আওয়ামী পরিবারে জিম্মি হরিরামপুরের বালুমহাল!

সাইফুল ইসলাম : মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার লেছড়াগঞ্জ বালুমহাল ঘুরে ফিরে একটি প্রভাবশালী আওয়ামী পরিবার নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে। ধারাবাহিকভাবে দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করলেও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ থাকছে একটি নির্দিষ্ট চক্রের হাতে। আগামী ১৪৩৩ বাংলা সনের ইজারাও একই সিন্ডিকেট নিজেদের দখলে নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

Harirampur

জানা গেছে, বালুমহাল সিন্ডিকেটের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছে উপজেলার আজীমনগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আলী আকবর খান ও তার ভাই আকিবুল হাসান খান।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৪৩০ বাংলা সনে লেছড়াগঞ্জ বালুমহালের ইজারা মূল্য ছিল ৪ কোটি ৩ লাখ টাকা। ওই বছর ইজারা পায় আলমগীর এন্টারপ্রাইজ, যা জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক ও হরিরামপুর উপজেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান দেওয়ান সাইদুর রহমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।

পরের বছর ১৪৩১ সনে ইজারার মূল্য হঠাৎ বেড়ে দাঁড়ায় ১১ কোটি ১১ লাখ ১১ হাজার ১১১ টাকায়। এ সময় ইজারা পায় আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি মমতাজ বেগমের ঘনিষ্ঠ ও জেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক আবিদ হাসান বিপ্লবের প্রতিষ্ঠান এশিয়ান বিল্ডার্স। তবে অভিযোগ রয়েছে, ইজারা নেওয়ার পর চুক্তির মাধ্যমে বালুমহালের কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় আলী আকবর খান ও আকিবুল হাসান খান পরিবারের কাছে।

১৪৩২ সনে ইজারার মূল্য আবার কমে দাঁড়ায় ৫ কোটি ৩২ লাখ ৩২ হাজার ৩২ টাকা। ইজারা পায় ফরিদপুরভিত্তিক মিথিলা এন্টারপ্রাইজ, যার মালিক স্থানীয়ভাবে যুবলীগ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে জানা যায়। সেসময় স্থানীয় বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বালুমহালটির নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নেয়। তখন বালুমহালের সাথে সম্পৃক্ত নেই জানিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করে আলী আকবর খান ও আকিবুল হাসান খান। তবে এর কয়েকমাস পরেই প্রভাব খাটিয়ে আবারও সেই বালুমহারটির নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নেয় আলী আকবর খান, আকিবুল হাসান খান ও তাদের সিন্ডিকেট।

আগামী ১৪৩৩ সনের ইজারা নিয়ে পরিস্থিতি আরও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৭ কোটি ৪২ লাখ ৪৮ হাজার ৮০ টাকা। প্রথম দফায় ১৪টি সিডিউল বিক্রি হলেও জমা পড়ে মাত্র ৩টি। অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- খান এন্টারপ্রাইজ, সজীব করপোরেশন ও জমিদার এন্টারপ্রাইজ। অভিযোগ রয়েছে, এর মধ্যে খান এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. বিল্লাল খান ও সজীব করপোরেশনের মালিক মো. সুরুজ খান আওয়ামী লীগ নেতা আলী আকবর খান ও আকিবুল হাসান খানের চাচাতো ভাইয়ের ছেলে। খান পরিবারের সদস্য হয়ে সিন্ডিকেট করে নিজস্ব ঠিকাদার দিয়ে বালুমহালটি নিজেদের দখলে নেয়ার এই পায়তারায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ইন্ধন রয়েছে আলী আকবর খান, আকিবুল হাসান খানের-এমনটাই অভিযোগ স্থানীয়দের।

বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটি ও জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, প্রথম দফায় খান এন্টারপ্রাইজ প্রস্তাব দেয় ২ কোটি ২০ লাখ টাকা, সজীব করপোরেশন প্রস্তাব দেয় ১ কোটি ৯০ লাখ টাকা এবং জমিদার এন্টারপ্রাইজ প্রস্তাব দেয় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

প্রথমবার সরকারি মূল্যের তুলনায় দর অনেক কম হওয়ায় দরপত্র বাতিল করে পুনরায় আহ্বান করা হয়। দ্বিতীয় দফায়ও পূর্বের ওই তিনটি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নেয় এবং মূল্য প্রস্তাব দেয়। এবারে খান এন্টারপ্রাইজ প্রস্তাব দেয় ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা, সজীব করপোরেশন প্রস্তাব দেয় ২ কোটি ৩০ লাখ টাকা এবং জমিদার এন্টারপ্রাইজ প্রস্তাব দেয় ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২য় দফাতেও দর সরকার নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় অনেক কম থাকায় পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। তৃতীয় দফার দরপত্র আগামী ৮ এপ্রিল উন্মুক্ত করা হবে।

তবে স্থানীয়রা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আগের মতো এবারও একই সিন্ডিকেট প্রভাব খাটিয়ে কম মূল্যে বালুমহালটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করবে।

স্থানীয়দের দাবি, সম্ভাব্য অন্যান্য দরদাতাদের সঙ্গে সমঝোতা করে প্রতিযোগিতা সীমিত করা হয়েছে, যাতে কম মূল্যে বালুমহালটি হাতিয়ে নেওয়া যায়।
হরিরামপুরের কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রতি বছরই নতুন নামে ইজারা হলেও নিয়ন্ত্রণ থাকে আলী আকবর-আকিব খান পরিবারের হাতে। দরপত্র শুধু আনুষ্ঠানিকতা।

স্থানীয় আরেকজন বাসিন্দা দাবি করেন, এভাবে কম দামে ইজারা হলে সরকার কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে। কিন্তু কেউ কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না। প্রশাসনও কার্যকর কোন উদ্যোগ গ্রহণ করছে না।

উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল হান্নান মৃধা বলেন, প্রথম দফায় ১৪টি শিডিউল বিক্রি হলেও জমা পড়েছে মাত্র তিনটি। আর মূল্য প্রস্তাব করা হয়েছে অনেক কম। শুনেছি সিন্ডিকেট করে এটা করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ নেতা আলী আকবর খান বলেন, গতবছর আমি বালুমহাল থেকে সড়ে এসেছি। এ সম্পর্কে আমার কোন ধারণাও নেই, এ বিষয়ে আমি কিছু বলতেও পারবো না।

তার ভাই আকিবুল হাসান খান বলেন, খান এন্টারপ্রাইজ আমাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান, সজীব করপোরেশন আমাদের পরিচিত লোকের। আর জমিদার এন্টারপ্রাইজও আমাদের পরিচিত লোকেরই। তিনি বিএনপি নেতা মোতালেব ভাইয়ের ভাতিজা।

মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, প্রথম দুই দফায় সরকার নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় দর কম আসায় পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।

সিন্ডিকেট করে কম মূল্যে শিডিউল জমা দেয়ার বিষয়ে কোন ব্যবস্থা নেয়া হবে কি’না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী আমাদের কাজ করতে হবে। আইনে তদন্তের কোন নির্দেশনা নেই। আমি আগ বড়িয়ে তো তদন্ত কমিটি করতে পারিনা। পরবর্তী দরপত্র জমা হওয়ার পর যাচাই বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। আবারও কম দর প্রস্তাব পেলে বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে অবগত করা হবে। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Leave a Comment