পশ্চিম মানিকগঞ্জে বিএনপি নেতা রাজা মিয়ার ত্রাসের রাজত্ব!

সাইফুল ইসলাম : মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বানিয়াজুরী ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য রাজা মিয়ার বিরুদ্ধে বসতবাড়িতে হামলা-ভাঙচুর, এক বৃদ্ধ দম্পতিকে মারধর এবং একাধিক অবৈধ অস্ত্র মজুদের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

Raza Member

অভিযুক্ত রাজা মিয়া ঘিওর উপজেলার বানিয়াজুরী ইউনিয়নের তরা গ্রামের বাসিন্দা এবং জামাল মিয়ার ছেলে। তিনি উপজেলা বিএনপির স্থানীয় সরকার বিষয়ক সম্পাদক ও মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য এস এ জিন্নাহ কবীরের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। সম্প্রতি পূর্ব বিরোধের জেরে একই গ্রামের বাসিন্দা হারেজ আলী ও তার পরিবারের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।

ভুক্তভোগী হারেজ আলীর অভিযোগ, পূর্বের বিরোধকে কেন্দ্র করে রাজা মিয়া ও তার সমর্থকেরা আকস্মিকভাবে তার বাড়িতে হামলা চালান। এ সময় তাকে বেধড়ক মারধর করে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয় এবং ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়। তার স্ত্রীকেও লাঞ্ছিত ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন হারেজ আলী।

হারেজ আলীর স্ত্রী রোকেয়া ও কন্যা দাবি করেন, ইউপি সদস্য রাজা ও তার ছেলেসহ কয়েকজন লোক এসে হারেজ আলীর উপর হামলা চালায় এবং মারধর করে। স্থানীয় এক নারী বলেন, রাজা মেম্বার বাড়ির ওপর এসে হামলা চালিয়েছে। তিনি আমাকেও টেনে হেচড়ে হেনস্তা করেছে। তিনি একজন জনপ্রতিনিধি হয়ে কিভাবে এসব কর্মকাণ্ড ঘটায়, এটা দুঃখজনক।

স্থানীয় সূত্র জানায়, দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। হামলার পর এলাকাবাসী পুলিশে খবর দিলে ঘিওর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কয়েকটি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করে। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় আহত হারেজ আলীকে উদ্ধার করে মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়।

এদিকে, রাজা মিয়ার বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্র মজুদের পৃথক অভিযোগও উঠেছে। একাধিক স্থানীয় সূত্রের দাবি, তার হেফাজতে অন্তত পাঁচটি অবৈধ পিস্তল রয়েছে, যেগুলোর কোনো বৈধ লাইসেন্স নেই। এছাড়া তরা এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা লিটনের কাছে থাকা একটি অবৈধ পিস্তল ২০২৪ সালের আগস্টের পর রাজা মিয়া নিজের দখলে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বিগত সময়ে অস্ত্রটি পাবনা জেলা থেকে অবৈধভাবে কেনা হয়েছিল।

আরও অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়ি থেকে হারিয়ে যাওয়া কিছু অস্ত্র পরবর্তীতে পাবনা ও সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং এ ঘটনায় রাজা মিয়ার সম্পৃক্ততা থাকতে পারে—এমন অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয়দের ভাষ্য, রাজা মিয়ার বিরুদ্ধে অতীতেও ডাকাতি ও অস্ত্রসহ একাধিক ফৌজদারি মামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ২০১০ সালের একটি ডাকাতি মামলায় তাকে নয় বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন মানিকগঞ্জ যুগ্ম দায়রা জজ আদালত।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছেন এবং ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে আধিপত্য বজায় রেখেছেন। তরা এলাকার বাসিন্দা হাফেজ বোরহানের ভাগিনা বাশারের ওপর সশস্ত্র হামলার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, পিস্তলের বাট দিয়ে মাথায় আঘাত করলে বাশার গুরুতর আহত হন। ভুক্তভোগীদের দাবি, ভয় ও প্রভাবের কারণে এ ঘটনায় কার্যকর মামলা দায়ের করা সম্ভব হয়নি।

রাজা মেম্বারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান এবং প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

জেলা গোয়েন্দা বিভাগের একটি বিশেষ সূত্রের দাবি, অবৈধ অস্ত্র মজুদের তথ্য পাওয়ার পর রাজা মিয়ার নাম-ঠিকানা ও বিস্তারিত তথ্য স্থানীয় সেনাক্যাম্পে সরবরাহ করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজা মিয়া বলেন, “হারেজ আলীর ওপর হামলার ঘটনায় আমি কিছুই জানি না। তার সঙ্গে আমার কোনো বিরোধ নেই। ঘটনার সময় আমি বাড়িতে ছিলাম, এর সিসিটিভি ফুটেজ রয়েছে। স্থানীয় মাদ্রাসার সামনের সড়কে কে কে অস্ত্র নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করেছে, সেটির ফুটেজও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের কাছে আছে।”

ডাকাতি মামলা ও অবৈধ অস্ত্রের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, “আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমার বিরুদ্ধে একাধিক মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছিল। ডাকাতির মামলাটিও ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বর্তমানে যারা আমার সম্মান ক্ষুণ্ন করতে মিথ্যা অভিযোগ করছে, তারা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। যে নারী সাক্ষ্য দিয়েছেন, তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে এবং সম্প্রতি তারা মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন।”

ঘিওর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর মাহবুবুর রহমান বলেন, “ঘটনার সময় আমি ছুটিতে ছিলাম। তখন ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। ভুক্তভোগীদের লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে, তবে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

Leave a Comment